যুক্তরাজ্যের অ্যাসাইলাম প্রতারণা!

ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্য আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) নিয়ে প্রতারণা করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয় বা ভিন্নমত প্রকাশের কারণে নিপীড়নের শিকার এবং নিজ দেশে প্রাণ ঝুঁকির মুখে-এমন ব্যক্তিরা যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চাইতে পারেন। এটি অ্যাসাইলাম আবেদন নামে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার এবং আবেদনের সঙ্গে দেওয়া প্রমাণাদির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ম।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির স্বরাষ্ট্র দপ্তরের (হোম অফিস) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অ্যাসাইলাম আবেদন প্রত্যাখ্যান করার (রিফিউজ) আগাম মনোভাব নিয়েই আবেদনগুলো বিবেচনা করেন। পরিস্থিতি এমন যে, কখনো কাউকে অ্যাসাইলাম দেননি এমন কর্মকর্তারা সেখানে গর্ববোধ করেন। আর অ্যাসাইলাম আবেদন নিয়ে হোম অফিসের কর্মকর্তাদের এমন আচরণের কথা ফাঁস করে দিয়েছেন সাবেক তিন কর্মকর্তা। হুইসেল ব্লোয়ার (ফাঁসকারী) ওই তিন কর্মকর্তার বরাত দিতে রোববার প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ান।

হোম অফিসের সাবেক ওই কর্মকর্তারা বলেন, মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের ঘটনাও আছে। কিন্তু অ্যাসাইলাম আবেদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা সাধারণত ধরেই নেন যে, আবেদনকারী মিথ্যা বলছে। অনেক কর্মকর্তা সাক্ষাৎকারের সময় আবেদনকারীর প্রতি বিদ্রুপমূলক আচরণ করেন। অন্য সহকর্মীর সঙ্গে আবেদনকারীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার গল্প নিয়ে হাসাহাসি করেন।

ফাঁসকারী কর্মকর্তারা জানান, অ্যাসাইলাম আবেদন গ্রহণ করার প্রবণতা এতটাই কম যে, কালে-ভদ্রে কোনো কর্মকর্তা অ্যাসাইলাম আবেদন অনুমোদন করলে সেটি নিয়ে বিদ্রূপাত্মক গর্ব করা হয়। আরেক কর্মকর্তার কথা স্মরণ করে একজন বলেন, ওই কর্মকর্তা তিন বছর যাবৎ দায়িত্বে থাকলেও কখনো কোনো আবেদনকারীকে আশ্রয় প্রদান করেননি। এ নিয়ে ওই কর্মকর্তা গর্ব করে বেড়াতেন।

এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এক আবেদনকারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রমাণস্বরূপ একটি ছবি দিয়েছিল। ছবিটিতে আবেদনকারীর নিতম্ব দেখা যাচ্ছিল। আবেদনকারী যাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অন্য সহকর্মীদের ছবিটি দেখিয়ে হাসাহাসি করেন।

সাবেক এই কর্মকর্তারা জানান, কর্মী সংকটের কারণে হোম অফিসে কাজের প্রচণ্ড চাপ। প্রতি কর্মীকে বছরে ২২৫টি আবেদনের সিদ্ধান্ত প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যে কারণে তাদের পক্ষে আবেদনগুলোর যথাযথ বিবেচনা সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আবেদন না দেখেই কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়া আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নেন। আর ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করে প্রতিবেদন তৈরি করে দেন। যেমন- কোনো আবেদনকারী নিজ দেশে সরকারি নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি করল। একই বিষয়ে অতীতের কোনো সিদ্ধান্ত কপি করে এনে প্রতিবেদন বানিয়ে দেওয়া হয়।

গত নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যাসাইলাম আবেদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ৩১৯। জুলাইতে গিয়ে তা কমে হয় ২২৮ জন। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে কর্মীর সংখ্যা আবার বাড়িয়ে ৩৫২ জন করা হয়। কিন্তু এর এক চতুর্থাংশ কর্মী ৬ মাসের আগেই চাকরি ছেড়ে চলে যায়।

হোম অফিসের মুখপাত্র বলেন, অভিযোগগুলো সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে যাদের সুরক্ষার দরকার তাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের গর্বিত ঐতিহ্য রয়েছে। যথাযথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে যুক্তরাজ্য ৩৪ শতাংশ আবেদনকারীকে আশ্রয় দিয়েছে। আর ওই সময়ে বাংলাদেশিদের আবেদন সফল হওয়ার হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। ওই বছর মোট ৩০ হাজার ৬০৩ জন অ্যাসাইলাম আবেদন করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন এক হাজার ৯৩৯ জন।