সেঞ্চুরিতে চেনা মুমিনুল, উদযাপনে অচেনা

সেঞ্চুরির সঙ্গে তার সখ্য পুরোনো। এই মাঠের সঙ্গে সম্পর্কও। গত কিছুদিনে দুটি সম্পর্কেই মরচে পড়েছিল খানিকটা। এবার সেসব ঝালাই করলেন মুমিনুল হক। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে কাটালেন সেঞ্চুরি খরা। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামকে আবারও প্রমাণ করলে পয়মন্ত। এ পর্যন্ত ছিলেন চেনা রূপেই। তবে চমকে দিলেন উদযাপনে। ফুটে উঠল যেন অন্য মুমিনুল!

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিনেই দারুণ এক সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছেন মুমিনুল। ব্যাটিংয়ের মতো দেখার মত হলো তার উদযাপনও।

সেঞ্চুরি ছোঁয়া শটে বল যখন ছুটছে বাউন্ডারিতে, মুমিনুল তখন মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ছুড়লেন বাতাসে। ব্যাট-হেলমেট উঁচিয়ে তোলার প্রথাগত উদযাপন তো ছিলই। তবে অনেকটা ছুটে গেলেন ড্রেসিং রুমের দিকে। বাতাসে ছুড়লেন ব্যাটও। মুখে নেই হাসি। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় কোনো কিছু অর্জনের ছায়াই যেন থাকল মুখায়বের কাঠিন্যে।

মাঠের ভেতরে-বাইরে বরাবরই অন্তর্মুখী মুমিনুল। শান্ত এবং চাপা স্বভাবের। উচ্ছ্বাস কিংবা বেদনা, কোনোটিরই বাড়াবাড়ি দেখা যায় না তার মাঝে। এর চেয়ে ভালো, বড় ইনিংসও খেলেছেন। বরাবরই উদযাপনে তিনি পরিমিত। সেই মুমিনুলই এদিন ভীষণ খ্যাপাটে।

এদিন উত্তাল ছিল তার ব্যাটও। যখন নেমেছিলেন, তামিম ইকবালের সৌজন্যে দল পেয়েছিল ভালো ভিত। কন্ডিশন-উইকেটও দারুণ ব্যাটিং সহায়ক। মুমিনুল কাজে লাগালেন দারুণ ভাবে। ছোটালেন স্ট্রোকের ফোয়ারা। টানা দুই বলে বাউন্ডারিতে সেঞ্চুরি করলেন ৯৬ বলেই।

বাংলাদেশের হয়ে এটি দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি। ২০১০ সালে সালে লর্ডসে তামিমের ৯৪ বলে সেঞ্চুরি এখনও দ্রুততম। মুমিনুলের আরেকটি সেঞ্চুরি আছে ৯৮ বলেও।

২৬ টেস্টে এটি তার পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরি। তবে চার থেকে পাঁচে আসতে পেরিয়েছেন অনেকটা পথ। ৪ সেঞ্চুরি হয়ে গিয়েছিল প্রথম ১২ টেস্টেই। পরের ১৩ টেস্টে সেঞ্চুরি নেই। পঞ্চাশ ছুঁয়েছেন মাত্র ৫ বার। এই সময়ে ব্যাটিং গড় ছিল ২৭.৯১। এই ধাক্কায় ক্যারিয়ার গড়ও অতিমানবীয় থেকে নেমে এসেছে সাধারণের কাতারে। অবশেষে কাটল সেই খরা। সবশেষ ২০১৪ সালে সেঞ্চুরি করেছিলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

মাঝের ওই সময়টায় ‘আড়ি’ চলছিল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের সঙ্গেও। এই মাঠে প্রথম তিন টেস্টেই করেছিলেন তিন সেঞ্চুরি। এরপর তিন টেস্টে নেই কোনো পঞ্চাশও। সম্পর্কটা আবার উষ্ণ হলো এবারের সেঞ্চুরিতে। এখানে ৭ টেস্টেই ৪ সেঞ্চুরি! চা বিরতির সময় রান ছিল তার ১০৭।

তবে এই খরা কাটানোই কেবল নয়, মুমিনুলের উদযাপনে কারণ থাকতে পারে আরও। তার ওপর সাবেক কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহের বিরাগ ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটে একরকম ‘ওপেন সিক্রেট’। হাথুরুসিংহের সময়ে বাদ পড়েছেন ওয়ানডে থেকে, টেস্ট থেকেও প্রথমবার বাদ পড়েছিলেন হাথুরুসিংহের সময়েই।

হাথুরুসিংহে কোচ হওয়ার কিছুদিন পরই শর্ট বলে মুমিনুলের দুর্বলতার কথা বলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। গত বছর শ্রীলঙ্কা সফরে গল টেস্টে দিলরুয়ান পেরেরা অফ স্পিনে আউট হওয়ার পর সেই সময়ের কোচ বলেছিলেন অফ স্পিনে মুমিনুলের দুর্বলতার কথাও। তাকে দেশের শততম টেস্টে একাদশ থেকে বাদ দিয়েছিলেন।

সেই মুমিনুল এবার বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেঞ্চুরি করলেন হাথুরুসিংহের দলের বিপক্ষেই। মুমিনুলের উদযাপনে কি মিশে থাকল অতীতের ক্ষোভও?

মুমিনুলের সেঞ্চুরি উদযাপনের আগেই উল্লাস শুরু করেছিলেন উইকেটে তার সঙ্গী মুশফিকুর রহিম। হাথুরুসিংহের সঙ্গে তার শীতল সম্পর্কের কথাও ছিল প্র্রায় প্রকাশ্য। মুমিনুলের উদযাপনে মুশফিকের উল্লাসও মিশে থাকল যেভাবে, চাইলে পুরোনো ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ধরনের কিছু বলে কেউ মেলাতেই পারেন!