হ্যাঁচকা টানে জীবন যায়

ব্যাগে ছিল দুটি স্মার্ট কার্ড। একটি মোবাইল ফোনসেট। পান-সুপারি। হাজারখানেক টাকা আর কিছু প্রসাধনী। ব্যাগ এবং ব্যাগের ভেতরে জিনিসপত্রের আর্থিক মূল্য খুব বাড়িয়ে ধরলেও ১০ হাজার টাকার বেশি হবে না। কিন্তু এই কটি টাকার জন্যই হেলেনাকে রাস্তায় বেশ কিছু দূর টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। একসময় তিনি রাস্তায় ছিটকে পড়লে গাড়ির পেছনের চাকা পিষে ফেলে তাঁর মাথা। তারপর সব শেষ।

হেলেনা ডান হাত দিয়ে স্বামী মনিরুল ইসলামের বাঁ হাত ধরে ছিলেন। ছিনতাইকারীরা তাঁর কাঁধের ব্যাগে টান দিলে হেলেনার হাত পেঁচিয়ে যায় ব্যাগের হাতলে। হাত গিয়ে চলন্ত গাড়ির জানালার কাচে আটকে যায়।

মনিরুল জানালেন, গাড়ি স্পিডে চলছে। তিনি দৌড়ে যাচ্ছেন গাড়ির পিছু পিছু। টানাহেঁচড়ায় তাঁর স্ত্রী হেলেনা ততক্ষণে আধমরা। একসময় গাড়ির পেছনের চাকা চলে গেল হেলেনার মাথার ওপর দিয়ে। রাস্তার দুপাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষী ও অন্যান্য মানুষ ছিলেন। কেউ এগিয়ে আসেননি। মনিরুল যখন হেলেনার কাছে গেলেন, তখন হেলেনার দুই চোখ বাইরে বের হয়ে গেছে। মনিরুলের আক্ষেপ, ‘ওর শেষ কথা শোনার জন্যও এক মিনিট সময় পাইলাম না।’

২৬ জানুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডি সড়কে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন মনিরুল। স্ত্রীর দাফনের জন্য তিনি ছিলেন বরিশালে। ২৮ জানুয়ারি টেলিফোনেই কথা হলো মনিরুলের সঙ্গে। বললেন, ‘এক মেয়ে ও তিন ছেলে নিয়া আমি এখন মহাসাগরে ভাসতাছি। দুইজনের রোজগারে সংসার চলছিল। এখন আমার সংসার চলব কেমনে?’

মনিরুল-হেলেনা দম্পতির বিয়ে হয় ১৯৯২ সালে। মনিরুল যেন দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁদের বিয়ের দিনটি। ডিসেম্বর মাসের ২৭ তারিখ সকাল ১০টা ৩১ মিনিটে বিয়ে হয়েছিল। জানালেন, তাঁদের সংসারে প্রাচুর্য না থাকলেও তাঁরা শান্তিতে ছিলেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে মাদ্রাসায় এবং ছোট ছেলে স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে তিন ছেলেকে মানুষ করার জন্য তাঁরা টাকাপয়সাও জমাতে পারেননি।

হেলেনা রাজধানীর গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে আয়ার কাজ করতেন। যে জায়গায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, সেখান থেকে তাঁর বাসা ছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। হেলেনার স্বামী মনিরুল একটি কোম্পানিতে টেকনিশিয়ানের কাজ করেন। ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেই বরিশাল থেকে লঞ্চে করে ভোরে ঢাকায় পৌঁছান। ধানমন্ডি ৭ নম্বরে বাস থেকে নেমে সড়ক পার হতে গেলে সাদা রঙের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে দুর্বৃত্তরা হেলেনার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়।

রাজধানীতে শুধু হেলেনা নন, ভ্যানিটি ব্যাগ বা হাতব্যাগ ধরে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে বা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গত দুই মাসে মারা গেছেন নারী, শিশুসহ মোট চারজন। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর দয়াগঞ্জ এলাকায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে মায়ের কোল থেকে পড়ে মারা যায় ছয় মাসের শিশু আরাফাত। ছিনতাইকারীদের টার্গেট আরাফাত নয়, ছিল আরাফাতের মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ। শাহ আলম-আকলিমা দম্পতি এক ছেলের চিকিৎসা করাতে এসে আরেক ছেলে আরাফাতের লাশ নিয়ে গ্রামে ফেরেন।

রাজধানীর বাইরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ১৩ জুন চট্টগ্রামের জামালখানে চলন্ত রিকশায় ব্যাগ টান দেওয়ায় পড়ে যান তরুণী শিরিন আকতার। ১৯ জুন তিনি মারা যান। এ ঘটনায় পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী এরশাদসহ দুজন বর্তমানে কারাগারে আছেন।

প্রথম আলোর চট্টগ্রামের প্রতিনিধি গাজী ফিরোজ থানার সূত্রে জানিয়েছেন, চকবাজার থানায় এই মামলা তদন্তাধীন আছে। শিরিন আকতারের ভাই শহীদুল আলম মামলাটি করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘এ ধরনের মামলা দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দ্রুত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া সম্ভব হলে এ ধরনের ঘটনা কমবে।’ শিরিন ঈদের কেনাকাটা করার জন্য সন্ধ্যায় বের হয়েছিলেন।

ভ্যানিটি ব্যাগের হ্যাঁচকা টানে অনেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হন মারাত্মকভাবে। ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম আলো অনলাইনে ছাপা হয়েছিল ‘হানিমুনের টাকা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা করেছি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। এতে ৬০ জনের বেশি পাঠক মন্তব্যে বেশির ভাগই ছিনতাইকারীরা মানুষ কি না এবং পুলিশ-প্রশাসন কী করে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেননা, প্রতিবেদনটি ছিল এক বছর পাঁচ মাস আগে বিয়ে হওয়া এক দম্পতিকে নিয়ে। হানিমুনের টাকা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে হয় চিকিৎসক মুনতাহিদ আহসানকে। তাঁর স্ত্রী চিকিৎসক সানজানা জেরিন। তাঁরা ৩৩ তম বিসিএস উত্তীর্ণ।

২০১৪ সালের ২৪ আগস্টের ছিনতাইয়ের ঘটনায় হারিয়ে গেছে নববিবাহিত দম্পতির সুখ। সেদিন ভোর ছয়টার দিকে রিকশায় করে স্বামীর সঙ্গে জেরিন ফেনীর পরশুরামে তাঁর কর্মস্থলে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। রাজধানীর কমলাপুর ফুটবল স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাদা রঙের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে জেরিনের হাতব্যাগে হ্যাঁচকা টান দেওয়া হয়। এতে জেরিন ১০-১৫ ফুট দূরে গিয়ে পড়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। সেই ঘটনার পর থেকে জেরিনের চোখ-মুখে আর কোনো ভাষা নেই। বিছানায় নিথর দেহে প্রাণটা শুধু চলছে বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে। দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পর এতগুলো বছরেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। জেরিনের পুরো ঘরটাই এখন একটি হাসপাতালের মতো। জেরিনের স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা জেরিন আবার কবে কথা বলবেন, সেই আশায় বসে আছেন। ঘটনার পর মুগদা থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করে মামলা করেছিলেন মুনতাহিদ।

২০১৪ সালে বছরের শেষ দিকে রাজধানীর সোবহানবাগে রিকশা আরোহী আরেক নারী আয়শা আক্তারের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর ছয় বছরের সন্তান হয়েছিল মা-হারা। রিপার ব্যাগটিতে ছিল মাত্র সাত হাজার টাকা।

সমাজে এ ধরনের অস্থিরতার কারণ ব্যাখ্যা করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ এহসান হাবীব। তিনি বলেন, রাস্তাঘাটসহ কোনো জায়গায় এখন কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রসংগঠনসহ সবার মধ্যে মারাত্মক আক্রোশ দেখা দিচ্ছে। সমাজে মানুষ হত্যা করার বিষয়টি অনেকটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মানুষ হত্যা করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। ছিনতাই করা যায়, ব্যাগ ধরে টানলে মরে গেলে গেল, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এভাবে একধরনের সহনশীলতা তৈরি হয়ে গেছে সমাজে। আর ধরেই নেওয়া হচ্ছে, অন্যায় করলে কেউ ধরার নেই। শুধু দরিদ্র পরিবারের সন্তান নয়, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ বিভিন্ন পরিবারের সন্তানেরা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় বিশেষ করে নারী যাত্রীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায় বিভৎসভাবে কয়েকজন মারা গেছে। এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের চেকপোস্ট, টহলের সংখ্যা বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ জোরদার করা হয়েছে। আগের কয়েকটি ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ দেখে আসামিদের ধরা সম্ভব হয়েছে। হেলেনা বেগমের আসামিদেরও দ্রুত ধরা সম্ভব হবে।

মুনতাহিদ-জেরিন দম্পতিকে নিয়ে লেখা প্রতিবেদনে রাসেল নামের এক পাঠক মন্তব্যে লিখেছিলেন, ‘আমার ছোট বোনের ব্যাগও ঠিক একইভাবে টান দিয়ে নিয়ে যায় খিলগাঁও খিদমা হাসপাতালের সামনে থেকে। সময়টাও ছিল ভোর ৬টার দিকে। খিলগাঁও থানায় মামলা করতে গেলে নেয় নাই। খেয়াল করলে দেখবেন, এই ধরনের ছিনতাইগুলো হইতেছে ভোরে, একই কায়দায়, কিছু নির্দিষ্ট জায়গায়। গাড়ি, সময় আর ফাঁকা-সোজা রাস্তা; সবগুলোই ছিনতাইকারীদের পক্ষে।’

ঘটনা ঘটার পর ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মাথায় অনেক কিছু আসে, মনে হয় এই করলে বা এই ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এটা হতো না। কিন্তু ঘটনা তো ঘটেই চলেছে।

অধ্যাপক শাহ এহসান হাবীবের মতে, সমাজে কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করছে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে থাকে। বিভিন্ন কারণে সমাজের ‘সফটনেস’ কমে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এ ধরনের পরিবেশের ভেতর দিয়েই বড় হচ্ছে, যা তাদের আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে। অভিনব কায়দায় ছিনতাই করে মানুষ মেরে ফেলার এই অপরাধ কমানোর জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিলেন এই অধ্যাপক।